পন্ডিত ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর স্মরনে একটি গদ্য-কবিতা চেতনা

পৃথা সেন ( শিক্ষিকা,রবীন্দ্রনগর গার্লস হাইস্কুল,শিলিগুড়ি):
চেতনা

পৃথা সেন

ভোর রাতে ঘুম ভেঙে গেল…..রাত তখনও বেশ খানিকটা বাকী……অশান্ত মন নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম নির্জন শান্ত পথে…পথের দুপাশে নিম বট জারুলের শাখা প্রশাখা হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ….আকাশে তখন কৃষ্ণ পক্ষের শুরুর চাঁদ….চারপাশে কেমন যেন এক ভৌতিক বাতাবরন…..ভাল লাগছিল হাঁটতে…..হঠাৎই দূরে আগুনের লাল শিখা চোখে পড়ল….দ্রুত এগিয়ে গেলাম…দেখি, কে যেন আগুন জ্বেলেছে বর্ন পরিচয়ের স্তুপে…. দাউ দাউ করে জ্বলছে আমার ছোটোবেলার আত্ম পরিচয়পত্র ….দৌড়ে গিয়ে আধপোড়া কয়েকটি পৃষ্ঠা বুকে চেপে ধরি…..বুকের মধ্যে এক সুতীব্র যন্ত্রনা…..আমার পরিচয়পত্র পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে!! ….আমার পরবর্তী প্রজন্ম শিকড়হীন আলগা শৈবালের মত জীবন সমুদ্রে পাক খেতে খেতে জীবন্ত লাশ হয়ে যাবে!!….তারা পাবে না মাতৃভাষার সুঘ্রাণ!! ….তারা জানবে না মাতৃভাষার আস্বাদ!!….ভাড়াটে ভাষাকে আশ্রয় করে বেঁচে থাকা তো দাসত্বের সামিল………
বিষন্ন মনে এগিয়ে চলি…..হঠাৎই অন্ধকার ভেদ করে দূরে দৃষ্টি যায়……খাটো ধুতি, ফতুয়া, ঘাড়ে চাদর খর্বাকার এক বৃদ্ধ হেঁটে চলেছেন…. অস্পষ্ট তবু তাঁর ঋজু ভঙ্গি ও দৃপ্ত পদক্ষেপ ভীষণ স্পষ্ট ….দূরত্ব কমতেই আমার সমস্ত শরীরে শিহরণ জাগল….আমার সামনে যিনি পথ চলছেন তিনি আর কেউ নন…. বিদ্যাসাগর….আমার বুকে আঁকড়ে ধরা বর্ন পরিচয়ের মলাটের সেই আধপোড়া মানুষটা…..আমাদের সবার পূজনীয় ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর……..!খুব ইচ্ছে হল পা ছুঁয়ে প্রনাম করি….সাহসে কুলালো না…..হঠাৎই বজ্রনিনাদ কন্ঠ স্বরে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন…..তোমার বুকে বর্নপরিচয়ের আধপোড়া অবশেষ দেখছি! তুমি কি বাঙালী সন্তান ???…কম্পিত স্বরে উত্তর দিলাম…’হ্যাঁ’
তিনি আবারো প্রশ্ন করলেন,’আমাকে চেনো?’আবারো কাঁপা গলায় উত্তর দিলাম ‘ হ্যাঁ ‘তারপর অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে প্রশ্ন করলাম,”আপনি কেমন আছেন?”খাদে নেমে গেল তাঁর কন্ঠস্বর….হয়তো বা কান্না মেশানো ছিল তাতে….বললেন,”বড় কষ্টে আছি বাছা…….আমার মেয়েরা আজ নির্যাতিতা…..মা বোনের রক্তে ভেজা মাটি ভীষণ কাঁদে… যে শিক্ষার আলো আমি মেয়েদের জীবনে জ্বালতে চেয়েছি সেই আলোর অহঙকারী শিখায় তারা দৃষ্টি হারিয়েছে…. শিক্ষার সেই আলো লক্ষ প্রদীপের দীপাবলী হয়ে উঠতে পারেনি আজও।আমার শিশুরা আজ বিদেশী ভাষার মোহে দিক্‌ভ্রষ্ট। আমার বর্নপরিচয় আজ অবহেলিত…..ভাল থাকব কী করে বলতে
পারো'”?? আমার মনের প্রতিটি কোষে কোষে সেই প্রশ্ন অবিরত পাক খেতে থাকল…’ভাল থাকব কী করে বলতে পারো?”অনেক কথা বলতে চাইলাম। সব কথা যেন গলার কাছে জমাট বাঁধল। অবশেষে জানতে চাইলাম –“আপনিই কী অভিমানে বর্ন পরিচয়ের স্তূপে আগুন…….” আমার কথা শেষ না হতেই সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়লেন তিনি । তারপর আবার হাঁটতে শুরু করলেন। বললাম -” আজ আমার ঈশ্বর দর্শন হল…আপনার সাথে আমার এই ক্ষণিকের দেখা হওয়ার স্মৃতি আজীবন মনে থাকবে” মাথা নীচু করে প্রনাম করলাম তাঁকে।…আশির্বাদের ভঙ্গিতে মাথায় হাত রাখলেন। কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন।তারপর হঠাৎই প্রশ্ন করলেন,” একটা উপকার করবে বাছা?”বললাম,”আদেশ করুন”বললেন,”” আমার বাঙালী সন্তানদের একটা জিনিস হারিয়ে গেছে। তোমায় যদি দিই তুমি পৌঁছে দেবে প্রতি ঘরে?””বললাম,”নিশ্চয়ই দেব”তিনি আমার হাতে কাপড়ের এক ঝোলা ধরিয়ে দিয়ে কোথায় যেন নিমেষেই মিলেয়ে গেলেন। অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। তারপর ঝোলা খুলতেই দেখি অনেক গুলো অস্থি।আমি সেগুলো জুড়তেই দেখি তা মেরুদন্ডের আকার নিয়েছে!!সত্যিই তো! বাঙালীর আজ মেরুদন্ডটাই যে হারিয়ে গেছে! বিদ্যাসাগর সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন বাঙালীর কী প্রয়োজন…..বিদ্যাসাগর আজও বুঝতে পারেন আমাদের কী প্রয়োজন। আমার চেতনা, আমার বিবেক ,আমার সমস্ত স্বত্বা যেন শিহরিত!কানের কাছে হাজার শঙ্খধ্বনি! আমার অন্তর তখন শ্রদ্ধায় অঞ্জলিবদ্ধ করপুট হয়ে আছে…..সম্বিত ফিরে পেতেই তাঁর উদ্দেশ্যে গড় হয়ে প্রনাম করি….দুচোখে তখন অবিশ্রান্ত জলধারা…..
হঠাৎই ঘুম ভাঙল….চোখ মেলতেই ক্যালেন্ডারের পাতায় জ্বল জ্বল করে উঠল তারিখ টা….. ২৬শে সেপ্টেম্বর …..আজ বিদ্যাসাগরের জন্মদিন……